আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য পত্রিকা

'বন্দেমাতরম' দেড়শ বছরে, গানে সুর দেওয়া হয়েছিল চুঁচুড়ায়

পার্থ চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশিত: August 14, 2025
পাঠ করেছেন: ব্রততী দাস


বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম সংগীতের ১৫০ বছরে পদার্পণের বছর এই ২০২৫ সালেই। ১৮৭৬ (মতান্তরে ১৮৭৫) সালে নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে, একদিন মধ্যাহ্নে বসে এই গান রচনা করেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিম গবেষকদের অধিকাংশই মনে করেন, 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে (১৮৮২) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ছয় বছর আগেই বঙ্কিমচন্দ্র এই গানটি রচনা করেছিলেন।

হুগলি জেলায় ঋষি বঙ্কিম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হয়ে এলেন ১৮৭৬ সালের ২০ মার্চ। প্রথম প্রথম নৈহাটির কাঁঠালপাড়া থেকেই যাতায়াত করেছেন চুঁচুড়ায়। এর একমাত্র কারণ ‘বঙ্গদর্শন’ তখনও চলছে। কিন্তু ‘বঙ্গদর্শন’ বন্ধ হয়ে গেল ১৮৭৬ সালের মার্চে। বঙ্কিম জীবনীকারেরা অনেকেই বলেছেন, এই সময়পর্বে বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়িতে চলছিল পারিবারিক কলহ। ১৮৭৬ সালে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার স্বত্ব সঞ্জীবচন্দ্রকে দিয়ে এলেন। ১৮৭৭। কাঁঠালপাড়ার পাট চুকিয়ে বঙ্কিম সপরিবারে চলে এলেন চুঁচুড়ার জোড়াঘাটে। ভাড়া নিলেন পর পর দু'টি ঘর। একটি ঘর বৈঠকখানা। আর একটি অন্দরমহল।

বঙ্কিমচন্দ্র নৈহাটি থেকে চলে আসার পরে বন্ধ হয়ে গেল ‘বঙ্গদর্শন’। নৈহাটি থেকে চুঁচুড়ার জোড়াঘাটে দেখা করতে এলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ‘বঙ্কিমচন্দ্র কাঁঠালপাড়া’-তে শাস্ত্রী মহাশয় লিখছেন ‘লক্ষ্ণৌ হইতে ফিরিয়া আমি কাঁঠালপাড়ায় গিয়া দেখি, বঙ্কিমবাবু সেখানে নাই। শুনিলাম, তিনি চুঁচুড়ায় বাসা করিয়াছেন। শিবের মন্দিরের পাশে সে ঘরগুলিতে চাবী বন্ধ। বাগানটি গতপ্রায়। সেইদিনই বৈকালে চুঁচুড়ায় গেলাম ; দেখিলাম চুঁচুড়ায় জোড়াঘাটের উপর দুইটি বাড়ি ভাড়া করিয়াছেন, একটিতে তাঁহার অন্দরমহল, আর একটিতে তিনি নিজে বসেন। যেটিতে তিনি বসেন, সেটি একতলা। বাড়িটির একটি গেট আছে। যে ঘরটিতে তিনি বসেন তাহা একটি বড় হ'ল, গঙ্গার দিকে চারিটি জানালা। সে ঘরের পূর্বেও দেওয়ালটি গুটিকতক বড় বড় মোটা গোল থামের উপর, বর্ষাকালে তার নীচেও জল আসে। বঙ্কিমবাবু সেখানে বসিয়াছিলেন, সেদিন তার নীচে খুব জল ছিল। এক বৎসরের পর হঠাৎ আমাকে দেখিয়া তিনি খুশী হইলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘আপনি ত চুঁচুড়ায় বাসা করিয়াছেন, ইহার ভিতরে কিছু 'কৃষ্ণকান্তী' আছে? তিনি বলেন, ‘তুমি ঠিক বুঝিয়াছ। আমি বড় খুশী হইলাম, তোমার কাছে আমার বেশী কৈফিয়ত দিতে হইল না।‘

এই সময়ের বঙ্কিম জীবন নিয়ে যাঁরা লিখেছেন তাঁরা অনেকেই লিখেছেন জোড়াঘাটের ঠিক দক্ষিণ পাশের বাড়িতে তাঁর বৈঠকখানা এবং বৈঠকখানার দক্ষিণে দু'টি বাড়ির পর তাঁর অন্দর ছিল। অন্য বাড়ির পূর্ব অংশের চাতালটি স্তম্ভের ওপর নির্মিত। তার নিচে গঙ্গার স্রোত প্রবাহিত । ওই চাতালে বঙ্কিমচন্দ্র বসে থাকতেন। ভাগীরথীর শোভা আত্মস্থ করতেন। ঘরের ভিতরে সবচেয়ে বড় ঘরটিতে একটি ইজিচেয়ারেও তিনি বসে থাকতেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চুঁচুড়ায় থাকার সময়ে এই বৈঠকখানার ঘরটিতে ‘বন্দেমাতরম’ গানে সুর সংযোজনা করা হয়েছিল। জোড়াঘাটের এই বাড়িতে থাকার সময়ে প্রকাশ পেয়েছিল ‘রজনী’,’উপকথা’(‘ইন্দিরা’, ‘রাধারাণী’, ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ একসঙ্গে), ‘কবিতা পুস্তক’,’কৃষ্ণকান্তের উইল, ‘প্রবন্ধ পুস্তক’। লেখা শুরু করেন ‘বাঙলার ইতিহাস’ এবং ‘আনন্দমঠ’।

অক্ষয়চন্দ্র সরকার লিখছেন ‘... আনন্দমঠের সূতিকা- সমাচার আমি কিছু জানি।... যখন আনন্দমঠ সূতিকাগারে তখন ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায় এখানকার আর একজন ডেপুটি ছিলেন, বঙ্কিমবাবু তো একজন ছিলেন, উভয়েরই পাশাপাশি বাসা। সন্ধ্যার পর তিনি আসেন, আমিও যাই।... একদিন ক্ষেত্রবাবু আসেন নাই, বঙ্কিমবাবু ‘আনন্দমঠে’র শেষে যুদ্ধের ভাগ তাঁহার হাতের লেখা খাতায় আমায় পড়িতে দিলেন। আমি দেখিলাম, অজয় নদের উভয় পার্শ্ব স্থান, আমি 'স্তান' শব্দ বুঝিতে না পারিয়া 'সন্তাল' পড়িতেছিলাম -- মনে মনে।‘

এই চুঁচুড়ার বাড়িতে বসেই সুর দেওয়া হয়েছিল আনন্দমঠের ‘বন্দেমাতরম’-এ। এই গান লেখার ভূমি যদিও নৈহাটির বাড়িতে। তখন ‘বঙ্গদর্শন’ বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় বৌদ্ধিক পত্রিকা। একবার এই পত্রিকার পাতায় প্রকাশ উপযোগী বিষয়বস্তুর অভাব দেখা দিল। তখন পত্রিকার প্রেস সংক্রান্ত দিকটি দেখতেন পন্ডিত রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাহিত্য সম্রাটকে একটি লেখা দিতে বললেন। বললেন, বঙ্গদর্শনের পাদপূরণের কথা। বঙ্কিম রামচন্দ্রকে বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি এসে নিয়ে যাবেন। আমি লেখা দিয়ে দেব। চলে আসবেন আজই।‘

সেই মতো রামচন্দ্র দুপুর গড়ালে বঙ্কিমের বাড়িতে তাঁর লেখার ঘরে গেলেন। দেখলেন বঙ্কিমচন্দ্র ঘরে নেই। টেবিলে একটি লেখা পেপারওয়েট দিয়ে চাপা পড়ে আছে। লেখাটি রামচন্দ্র হাতে নিলেন। পড়তে লাগলেন। ভিতর থেকে কী এক উন্মাদনার স্রোত প্রবহিত হতে লাগল। বঙ্কিমচন্দ্র ঘরে এলেন। রামচন্দ্র বললেন, ‘এই লেখাটিতেই কাজ মিটে যাবে। রামচন্দ্র অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে কাগজটি নিয়ে নিলেন। বললেন, এই লেখার ভালো-মন্দ বোঝার সময় আসেনি। এর মর্ম সমগ্র ভারতবর্ষ একদিন বুঝবে। তখন হয়ত আমি বেঁচে থাকব না। আপনি থাকলেও থাকতে পারেন।‘ এই দিনের দুপুরটির বিবরণ দিয়েছেন বঙ্কিমের নিকটজন স্বয়ং পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

এরপর চুঁচুড়ার বাড়িতে বসে এই গানের সুরারোপ। অক্ষয়চন্দ্র সরকার সহ অনেকেই এই সুরারোপের বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন। যদিও এই গানের সুরারোপ নিয়ে অনেকে যদু ভট্টের কথা বলে থাকেন। কিন্তু সুরারোপের প্রসঙ্গে অক্ষয়চন্দ্র সরকারের নিজের লেখায় চুঁচুড়ায় সুরারোপের প্রসঙ্গটি আছে। চুঁচুড়ায় তখন দু'জন ডেপুটি। একজন বঙ্কিমচন্দ্র। অন্যজন ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সন্ধ্যা হলে বঙ্কিমের কাছে আসতেন তিনি। আসতেন অক্ষয়চন্দ্র সরকার। গানে গল্পে মেতে উঠতেন তাঁরা। ক্ষেত্রনাথ হারমনিয়াম টেনে সুর ভাজতেন। সেদিন সন্ধ্যা নেমেছে। ছলাৎছল বয়ে চলেছে গঙ্গা। বাইরে ঘন বৃষ্টির ধারা। মেঘে ছেয়েছে আকাশ। বুকের গভীরে মেঘমল্লার আছড়ে পড়ছে। বঙ্কিমচন্দ্র বের করে আনলেন নৈহাটির বাড়িতে লেখা ‘বন্দেমাতরম’। ক্ষেত্রনাথ তাতে সুর বসাচ্ছেন। রাত বাড়ছে। বঙ্কিমের কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না। আবার বসানো হচ্ছে সুর। শেষে মল্লারের গম্ভীর সুরে শান্ত হলেন ঋষি বঙ্কিম। আহ্লাদিত বঙ্কিম ‘আনন্দমঠ’ -এর প্রথম সংস্করণের প্রথম খন্ডের দশম পরিচ্ছেদে এই গানের তাল নির্দেশ করছেন ‘মল্লার’ --কাওয়ালি তাল। বন্দে মাতরং 0 ১ × ১।

‘বন্দেমাতরম’ রচনার দেড়শ বছরে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। এই গান ভারতবর্ষের জাতীয় স্তোত্র। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ঋক মন্ত্র হয়ে এই গান স্বদেশীদের অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে তরোয়ালের থেকেও শক্তিশালী হয়ে। এই গানে সুরারোপ করা হয়েছিল হুগলি জেলায়। নৈহাটিতে প্রায় দেড়শ বছর আগের এক দুপুরে লেখা হয়েছিল এই গান।

হুগলির জিরাট গ্রামের উদ্বাস্তুরা নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করেছিল একটি স্কুল। নাম – ‘জিরাট কলোনী হাইস্কুল’। সমস্ত বাংলায় সরকারি স্কুলগুলিতে যে সময় ছাত্র কমছে, সেখানে এই স্কুলে গত তিন বছর আগে শিক্ষার্থী ছিল ৪২০। এই দু'বছরে শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৬০০। এই স্কুলটি নানা কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে চলেছে দু'বছর ধরে। তেমনই একটি কার্য্ক্রম -- ঠিক দুপুর বারোটায় বিদ্যালয়ে বেজে ওঠে ‘বন্দেমাতরম’। তিন মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় স্কুল। শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষার্থী শিক্ষাকর্মী থেকে পথ চলতি মানুষ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায় বুকে হাত রেখে। ‘বন্দেমাতরমে’র জন্য থমকে দাঁড়ায় একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রশাসনিক ভবন। এই স্তব্ধতা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং সমকালীন সমাজে নতুন করে স্বদেশ চেতনা ও দেশপ্রেমের সঞ্চার ঘটাবে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস।

চুঁচুড়ার এই বাড়িতেই বন্দেমাতরম সংগীতে সুর দেওয়া হয়েছিল




হুগলির যে স্কুলটি বন্দেমাতরোমের জন্য প্রতিদিন দুপুরে স্তব্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ায় দেশকে শ্রদ্ধা জানাতে। সকলের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে। জিরাট কলোনী উচ্চ বিদ্যালয়।
এই লেখাটি শেয়ার করুন

নতুন লেখার নোটিফিকেশনের জন্য উদ্ভাসের ফেসবুক পেজ লাইক করুন

উদ্ভাসে দান করে এগিয়ে যেতে সাহায্য করুন

ভালোলাগা:
মন্তব্য:
;
©Copyright: Udbhabon